মা'আরিফুল হাদীস

معارف الحديث

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায় - এর পরিচ্ছেদসমূহ

মোট হাদীস ৩২২ টি

হাদীস নং: ২৮১
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ মুসলিম সাধারণের জন্যে ইস্তিগফার
২৮১. হযরত আবুদ্দারদা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি নারী-পুরুষ সকল মু'মিনের জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে মাগফিরাতের দু'আ করবে, সে ব্যক্তি আল্লাহর ঐ সব মকবুল বান্দার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে, যাদের দু'আ কবুল হয়ে থাকে এবং যাদের বরকতে পৃথিবীবাসীরা জীবিকা প্রাপ্ত হয়ে থাকে। (মু'জামে কবীর: তাবারানী সঙ্কলিত)
کتاب الاذکار والدعوات
عن أبي الدرداء قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "من استغفر للمؤمنين والمؤمنات كل يوم سبعا وعشرين مرة كان من الذين يستجاب لهم ويرزق بهم أهل الأرض" (رواه الطبرانى فى الكبير)
হাদীস নং: ২৮২
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ তাওবার দ্বারা বড় বড় গুনাহ মাফ হয়ে যায়

কুরআন ও হাদীসের দ্বারা জানা যায়, আল্লাহর রহমত অনন্ত অসীম এবং কল্পনাতীত প্রশস্ত। তাওবা এবং ইস্তিগফারের বদৌলতে তিনি বড় বড় গুনাহও মাফ করে দেন এবং বড় বড় দাগী পাপী-তাপীদেরকেও মার্জনা করে দেন। যদিও তাঁর মধ্যে কহর ও জালাল তথা ক্রোধ এর সিফাতও রয়েছে। আর তাঁর এ সিফাতটাও তাঁর উচ্চতম মর্যাদা অনুপাতে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান। কিন্তু তা কেবল ঐসব পাপী-তাপী ও অপরাধীদের জন্যে, যারা পাপকর্ম ও অপরাধ করার পরও তাওবা করে তাঁর দিকে রুজু হয় না এবং তাঁর কাছে মাফী ও মাগফিরাত প্রার্থনা করে না; বরং নিজেদের পাপাচারে অবিচল থেকে এ অবস্থায়ই দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করে। নিম্ন লিখিত হাদীসগুলির মর্ম ও পয়গাম তাই।

একশ' ব্যক্তির হত্যাকারী তাওবা করে মার্জনা লাভ করলো
২৮২. হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বর্ণনা করেছেন, তোমাদের পূর্বেকার কোন এক (নবীর) উম্মতের মধ্যে এক ব্যক্তি আল্লাহ্ নিরান্নব্বই জন বান্দাকে হত্যা করে। (তারপর তার মনে অনুতাপের সঞ্চার হয় এবং আখিরাতের ভয় জাগে) সে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে যে, সে এলাকার সবচাইতে বড় আলেম কে? (যাতে করে সে তাঁকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারে যে, আমার মার্জনার কী হবে?) লোকজন একজন সন্ন্যাসী (বা প্রবীণ দরবেশ) সম্পর্কে তাকে বললে সে তাঁর কাছে গিয়ে বললো যে, সে নিরানব্বইজন লোক হত্যা করেছে, তার জন্যে কি তাওবার কোন ব্যবস্থা আছে? (সেও মার্জনা পেতে পারে এমন কোন ব্যবস্থা কি তার জানা আছে? সে সন্ন্যাসী জবাবে বললেন: তা তো কোনমতেই হতে পারে না। তখন সেই নিরান্নব্বই খুনের অপরাধী ব্যক্তিটি সেই সন্ন্যাসীকেও হত্যা করে তার জীবনের একশ'টি খুন পুরো করলো। (কিন্তু তারপর আবার তার মনে সেই পূর্বের মত অনুতাপ ও মার্জনার চিন্তার উদ্রেক হয়।) তারপর সে আবার সবচাইতে বড় আলেম কে জানতে চায়। তখন তাঁকে একজন আলেমের সন্ধান দেওয়া হয়। তারপর সে তাঁর নিকট গিয়ে বললো যে, সে একশ'টি খুন করেছে। তার জন্যে কি তাওবার কোন ব্যবস্থা আছে? জবাবে তিনি বললেন: হাঁ, হাঁ, (এমন ব্যক্তির তাওবাও কবুল হতে পারে।) তার তাওবার পথে কে বাধার সৃষ্টি করতে পারে? (অর্থাৎ আল্লাহর মখলুকদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে তাওবার পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে। তারপর তিনি তাকে পরামর্শ দিলেন) তুমি অমুক জনপদে যাও। সেখান আল্লাহর কিছু ইবাদওগুযার বান্দা রয়েছেন। তুমিও তাঁদের সাথে মিলে ইবাদতে লিপ্ত হবে এবং তোমার স্ব-এলাকায় আর ফিরবে না। কেননা, এটা অত্যন্ত খারাপ এলাকা।

সে মতে সে ব্যক্তি রওয়ানা হয়ে পড়লো। যখন সে পথের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলো তখন আকস্মিকভাবে মৃত্যু তার সম্মুখে উপস্থিত হলো। এবার তাকে নিয়ে রহমতের ফেরেশতাদের এবং আযাবের ফেরেশতাদের মধ্যে বচসা শুরু হলো। রহমতের ফেরেশতারা বললেন: এ ব্যক্তি তাওবা করে আসছে এবং সাচ্চা দেলে আল্লাহমুখী হয়েছে। (এ জন্যে সে রহমত লাভের হকদার হয়ে গেছে।)

ওদিকে আযাবের ফেরেশতারা বললেন: এ ব্যক্তি কখনো কোন পুণ্য কাজ করেনি (উপরন্তু এক শতটি খুন করে এসেছে, এ জন্যে এ দাগী অপরাধী এবং আযাবের হকদার) এ সময় একজন ফেরেশতা (আল্লাহর হুকুমে) মানুষের বেশে সেখানে উপস্থিত হলেন। তাঁরা উভয় পক্ষ তাকেই সালিশরূপে মেনে নিলেন। তিনি এর ফয়সালা দিলেন এই যে, দুই জনপদের দূরত্ব মেপে নিন। (অর্থাৎ ফিৎনা-ফ্যাসাদ ও পাপচারপূর্ণ যে জনপদ থেকে ঐ ব্যক্তিটি রওয়ানা হয়েছে এবং আল্লাহর ইবাদতগুযার বান্দাদের যে জনপদের দিকে ঐ ব্যক্তি রওয়ানা করেছে। তারপর যে জনপদটি তার অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী, তাকে সে দলের অন্তর্ভূক্ত বলে গণ্য করুন! সে মতে যখন দূরত্ব মাপা হলো তখন দেখা গেল, যে জনপদের উদ্দেশ্যে সে রওয়ানা করেছে সেটাই অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী। তখন রহমতের ফেরেশতাগণ তার প্রাণ কবয করলেন।- (সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، أَنَّ نَبِيَّ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: " كَانَ فِيمَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ رَجُلٌ قَتَلَ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ نَفْسًا، فَسَأَلَ عَنْ أَعْلَمِ أَهْلِ الْأَرْضِ فَدُلَّ عَلَى رَاهِبٍ، فَأَتَاهُ فَقَالَ: إِنَّهُ قَتَلَ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ نَفْسًا، فَهَلْ لَهُ مِنْ تَوْبَةٍ؟ فَقَالَ: لَا، فَقَتَلَهُ، فَكَمَّلَ بِهِ مِائَةً، ثُمَّ سَأَلَ عَنْ أَعْلَمِ أَهْ لِ الْأَرْضِ فَدُلَّ عَلَى رَجُلٍ عَالِمٍ، فَقَالَ: إِنَّهُ قَتَلَ مِائَةَ نَفْسٍ، فَهَلْ لَهُ مِنْ تَوْبَةٍ؟ فَقَالَ: نَعَمْ، وَمَنْ يَحُولُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ التَّوْبَةِ؟ انْطَلِقْ إِلَى أَرْضِ كَذَا وَكَذَا، فَإِنَّ بِهَا أُنَاسًا يَعْبُدُونَ اللهَ فَاعْبُدِ اللهَ مَعَهُمْ، وَلَا تَرْجِعْ إِلَى أَرْضِكَ، فَإِنَّهَا أَرْضُ سَوْءٍ، فَانْطَلَقَ حَتَّى إِذَا نَصَفَ الطَّرِيقَ أَتَاهُ الْمَوْتُ، فَاخْتَصَمَتْ فِيهِ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ وَمَلَائِكَةُ الْعَذَابِ، فَقَالَتْ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ: جَاءَ تَائِبًا مُقْبِلًا بِقَلْبِهِ إِلَى اللهِ، وَقَالَتْ مَلَائِكَةُ الْعَذَابِ: إِنَّهُ لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ، فَأَتَاهُمْ مَلَكٌ فِي صُورَةِ آدَمِيٍّ، فَجَعَلُوهُ بَيْنَهُمْ، فَقَالَ: قِيسُوا مَا بَيْنَ الْأَرْضَيْنِ، فَإِلَى أَيَّتِهِمَا كَانَ أَدْنَى فَهُوَ لَهُ، فَقَاسُوهُ فَوَجَدُوهُ أَدْنَى إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي أَرَادَ، فَقَبَضَتْهُ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ " (رواه البخارى ومسلم واللفظ له)
হাদীস নং: ২৮৩
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ মুশরিক-কাফিরদের জন্যেও রহমতের মেনিফেষ্টো
২৮৩. হযরত ছাওবান (রা) থেকে বর্ণিত। আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি, এ আয়াতটির মুকাবিলায় আমি গোটা দুনিয়া (এবং এর অভ্যন্তরস্থ যাবতীয় নিয়ামত) ও লইতে পসন্দ করি না:
{يَاعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ } [الزمر: 53]
“হে আমার ঐসব বান্দারা, যারা গুনাহ করে নিজেদের প্রতি অবিচার করেছো এবং নিজেদেরকে ধ্বংস করে ফেলেছো, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।"
এক ব্যক্তি বলে উঠলো, হযরত, যে ব্যক্তি শিরক করেছে, সেও? তখন নবী করীম ﷺ চুপ করে রইলেন। তারপরে বললেন : - ألَا وَمَنْ أَشْرَكَ
"ওহে! শুনে নাও, মুশরিকদের জন্যেও (আমার মালিকের এ ঘোষণা।)
-(মুসনদে আহমদ)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ ثَوْبَانَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: " مَا أُحِبُّ أَنَّ لِيَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا بِهَذِهِ الْآيَةِ: {يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ، إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ} فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَمَنْ أَشْرَكَ؟ فَسَكَتَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ قَالَ: «إِلَّا مَنْ أَشْرَكَ» ثَلَاثَ مَرَّاتِ. (رواه احمد)
হাদীস নং: ২৮৪
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ তাওবা ও ইস্তিগফারের খাস খাস কালিমা

তাওবা ও ইস্তিগফারের যে হাকীকত বা তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়েছে, তা থেকে পাঠক নিশ্চয়ই উপলব্ধি করে থাকবেন যে, এতে আসল গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক বিচার্য বিষয় হচ্ছে তার স্পীরিট এবং অন্তরের অবস্থা। বান্দা যে ভাষায় বা যে শব্দমালা যোগেই তাওবা করুক না কেন, তা যদি সাচ্চা দেলে আন্তরিকভাবে হয়ে থাকে, তাহলেই তা তাওবা ও ইস্তিগফার এবং গ্রহণীয় হবে। এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তাওবা ও ইস্তিগফারের কিছু কলিমা শিক্ষা দিয়েছেন এবং এগুলির বিশেষ বিশেষ ফযীলত ও বরকতের কথা বর্ণনা করেছেন। এ সিলসিলার কয়েকখানা হাদীস নিম্নে পাঠ করুন!
২৮৪. বেলাল ইবনে য়াসার ইবনে যায়দ (ইনি নবী করীম ﷺ-এর আযাদকৃত দাস ছিলেন)১ তাঁর পিতামহ যায়দ (রা)-এর যবানীতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি এই বলে আল্লাহ তা'আলার দরবারে ইস্তিগফার ও তাওবা করবে:
اَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
(আমি সেই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, যিনি চিরঞ্জীব এবং চিরদিন কায়েম থাকবেন এবং তাঁর সমীপে তাওবা করছি।)
তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন- যদি যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পলায়নের মত গুনাহও সে ব্যক্তি করে থাকে।
(তিরমিযী ও আবূ দাউদ)

টিকা ১. হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিছা নন, ইনি এক ভিন্ন যায়দ, যার পিতার নাম ছিল বূলী। ইনিও সাহাবী ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকেও আযাদ করেছিলেন।
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ بِلاَلَ بْنَ يَسَارِ بْنِ زَيْدٍ، مَوْلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: حَدَّثَنِي أَبِي، عَنْ جَدِّي، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: مَنْ قَالَ أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الحَيَّ القَيُّومَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ، غُفِرَ لَهُ وَإِنْ كَانَ فَرَّ مِنْ الزَّحْفِ. (رواه الترمذى وابوداؤد)
হাদীস নং: ২৮৫
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ সাইয়েদুল ইস্তিগফার

নিম্নে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাইয়েদুল ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার সর্বোত্তম দু'আর শব্দমালা নির্দেশ করে এর অনন্য সাধারণ ফযীলত বর্ণনা করেছেন। বিষয়বস্তুর বিচারে আসলেও এটি এরূপ কালিমাই।
২৮৫. হযরত শাদ্দাদ ইব্‌ন আওস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, সেরা ইস্তিগফারের দু'আ 'সাইয়েদুল ইস্তিগফার' হচ্ছে বান্দা আল্লাহ তা'আলার দরবারে আরয করবে:

اَللّٰهُمَّ أَنْتَ رَبِّيْ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِيْ وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلٰى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوْءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوْءُ لَكَ بِذَنْبِيْ فَاغْفِرْ لِي ْ فَإِنَّهٗ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا أَنْتَ

“হে আল্লাহ! তুমিই আমার মালিক-প্রতিপালক, তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছো এবং আমি তোমার বান্দা এবং আমি আমার সাধ্যমত তোমার সাথে কৃত ঈমানী ওয়াদার উপর কায়েম থাকবো। আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে। আমি আমাকে প্রদত্ত তোমার নিয়ামত রাশির কথা স্বীকার করি এবং নিজের গুনাহরাশিও স্বীকার করি। সুতরাং তুমি আমাকে মার্জনা করে দাও। কেননা, তুমি ব্যতীত গুনাহ মার্জনা করার মত আর কেউই নেই।"
রাসূলুল্লাহ ﷺ ফরমান: যে বান্দা ইখলাস ও আন্তরিকতার সাথে দিনের কোন অংশে আল্লাহর দরবারে এ আরয (অর্থাৎ এ শব্দমালাযোগে ইস্তিগফার করবে) এবং ঐদিন রাত আসার পূর্বেই তার মৃত্যু হয়ে যাবে, সে নিশ্চিতভাবে জান্নাতবাসী হবে, আর যে ব্যক্তি রাতের কোন অংশে আল্লাহর দরবারে এরূপ আরয করবে আর সকাল হওয়ার পূর্বেই মারা গেল, সে ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই জান্নাতবাসী হবে। (সহীহ বুখারী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: سَيِّدُ الِاسْتِغْفَارِ أَنْ تَقُولَ: اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لاَ إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ " قَالَ: «وَمَنْ قَالَهَا مِنَ النَّهَارِ مُوقِنًا بِهَا، فَمَاتَ مِنْ يَوْمِهِ قَبْلَ أَنْ يُمْسِيَ، فَهُوَ مِنْ أَهْلِ الجَنَّةِ، وَمَنْ قَالَهَا مِنَ اللَّيْلِ وَهُوَ مُوقِنٌ بِهَا، فَمَاتَ قَبْلَ أَنْ يُصْبِحَ، فَهُوَ مِنْ أَهْلِ الجَنَّةِ» (رواه البخارى)
হাদীস নং: ২৮৬
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ সাইয়েদুল ইস্তিগফার
২৮৬. হযরত আবূ মূসা আশ'আরী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তা'আলার দরবারে এভাবে দু'আ করতেন:

اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي وَجَهْلِي وَإِسْرَافِي فِي أَمْرِي وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِي هَزْلِي وَجِدِّى وَخَطَايَايَ وَعَمَدِي

“হে আল্লাহ! আমার ভুলচুক (ইলম ও মা'রিফতের চাহিদার খেলাফ) আমার মূর্খতা-নাদানী, আমার কার্যকলাপে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন এবং আমার যে সব অনাচার সম্পর্কে তুমি আমার চাইতে বেশি অবহিত, সে সব গুনাহ মাফ করে দাও!

হে আল্লাহ! মাফ করে দাও আমার-হাসি তামাশা বশে কৃত ও বুঝে-শুনে কৃত, অনিচ্ছাকৃতভাবে কৃত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত গুনাহসমূহ। আর এসব ধরনের গুনাহই আমার যিম্মায় রয়েছে।
(বুখারী ও মুসলিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنِ ابْنِ أَبِي مُوسَى عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ كَانَ يَدْعُو بِهَذَا الدُّعَاءِ: «اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي وَجَهْلِي، وَإِسْرَافِي فِي أَمْرِي، وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي. اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي هَزْلِي وَجِدِّي وَخَطَايَايَ وَعَمْدِي، وَكُلُّ ذَلِكَ عِنْدِي» (رواه البخارى ومسلم)
হাদীস নং: ২৮৭
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ হযরত খিযির (আ)-এর ইস্তিগফার
২৮৭. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে প্রায়ই বলতেন; হে আমার সাহাবীবৃন্দ! সামান্য কটি কালিমার সাহায্যে তোমাদের গুনাহগুলোর প্রতিবিধান করতে তোমাদেরকে কিসে মানা করলো? তাঁরা বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কী সে কালিমাগুলো? জবাবে তিনি বললেন: তোমরা তাই বলবে যা আমার ভাই খিযির বলতেন। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন: তিনি কী বলতেন? জবাবে তিনি বললেন, তিনি বলতেন:

اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْتَغْفِرُكَ لِمَا تُبْتُ إِلَيْكَ مِنْهُ ثُمَّ عُدْتُ فِيهِ وَاَسْتَغْفِرُكَ لِمَا أَعْطَيْتُكَ مِنْ نَفْسِي ثُمَّ لَمْ أُوْفِ لَكَ بِهِ وَاَسْتَغْفِرُكَ لِلنِّعَمِ الَّتِي أَنْعَمْتَ بِهَا عَلَى مَعَاصِيكَ وَاَسْتَغْفِرُكَ لَكَ فِي خَيْرٍ أَرَدْتُ بِهِ وَجْهَكَ فَخَالَطَنِي فِيْهِ مَا لَيْسَ لَكَ اَللّٰهُمَّ لَا تُخْزِنِي فَإِنَّكَ بِي عَالِمٌ وَلَا تُعِذِّبْنِي فَإِنَّكَ عَلَيَّ قَادِرٌ

"হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছি সে সব গুনাহ থেকে, যা থেকে আমি তাওবা করেছি, তারপর আবার তা করেছি এবং আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি তোমার দরবারে সে সব ওয়াদা-অঙ্গীকারের ব্যাপারে, যা আমি আমার নিজ সত্তার ব্যাপারে তোমার সাথে করেছি অথচ তারপর তা পূরণ করিনি। এবং আমি ইস্তিগফার করছি ঐ সব নিয়ামতের ব্যাপারে, যা তুমি আমাকে দান করেছো এবঙ আমি তোমার অবাধ্যতার জন্যে তা দিয়ে শক্তি লাভ করেছি (অর্থাৎ তোমার প্রদত্ত নিয়ামতের বলে বলীয়ান হয়ে তোমার অবাধ্যতায়ই লিপ্ত হয়েছি।) এবং আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি তোমার দরবারে ঐ সব পুণ্য কাজের ব্যাপারে, যেগুলো আমি তোমার সন্তুষ্টিরই উদ্দেশ্যে করেছি অথচ তারপর তোমার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য গরজের তাতে মিশ্রণ ঘটেছে। হে আল্লাহ! (অন্যদের সম্মুখে) তুমি আমাকে অপদস্থ করো না, কেননা, তুমি নিঃসন্দেহে আমার ব্যাপারে সম্যক অবগত রয়েছো, (আমার কোন কিছু তোমার কাছে গোপন নেই।) আর তুমি আমাকে (আমার গুনাহর জন্যে) শাস্তি দিও না, কেননা, তুমি আমার উপর সর্বব্যাপারে শক্তিমান (আর আমি বিলকুল অক্ষম এবং তোমার সম্পূর্ণ ইখতিয়ার ও কজার মধ্যে।) - (মুসনদে ফিরদাউস: দায়লামী সঙ্কলিত)
کتاب الاذکار والدعوات
عن ابن عمر قال: "كان رسول الله صلى الله عليه وسلم كثيرا ما يقول لنا: معاشر أصحابي ما يمنعكم أن تكفروا ذنوبكم بكلمات يسيرة؟ قالوا يا رسول الله: وما هي؟ قال تقولون مقالة أخي الخضر، قلنا يا رسول الله: ما كان يقول؟ قال كان يقول: اللهم إني أستغفرك لما تبت إليك منه، ثم عدت فيه، وأستغفرك لما أعطيتك من نفسي ثم لم أوف لك به، وأستغفرك للنعم التي أنعمت بها علي فتقويت بها على معاصيك وأستغفرك لكل خير أردت به وجهك فخالطني فيه ما ليس لك، اللهم لا تخزني فإنك بي عالم، ولا تعذبني فإنك علي قادر ". (رواه الديلمي)
হাদীস নং: ২৮৮
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইস্তিগফারের বরকতসমূহ

ইস্তিগফারের মূল উদ্দেশ্য এবং প্রতিপাদ্য তো হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার দ্বারা নিজেদের কৃত গুনাহসমূহ মার্জনা, যাতে করে বান্দা তার আযাব বা শাস্তি থেকে রেহাই পায়। কিন্তু কুরআন মজীদ পাঠে জানা যায় এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অত্যন্ত বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন যে, ইস্তিগফারের দ্বারা ইহলৌকিক অনেক বরকতও লাভ হয়ে থাকে এবং বান্দা এর কল্যাণে এ দুনিয়াতেও অনেক কিছু লাভকরে থাকে। আল্লাহ্ তা'আলা একীন ও আমল নসীব করুন।
২৮৮. হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে বান্দা ইস্তিগফারকে আকড়ে থাকে (অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার দরবারে অহরহ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে) আল্লাহ্ তা'আলা তার প্রতিটি সংকীর্ণতা ও মুশকিল থেকে নির্গমনের পথ করে দেবেন এবং তার সকল দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং এমন পন্থায় তাকে জীবিকা দান করবেন, যার কল্পনাও সে করতে পারবে না।
(মুসনদে আহমদ, সুনানে আবুদাউদ ও সুনানে ইবনে মাজা)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ لَزِمَ الِاسْتِغْفَارَ، جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا، وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا، وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ» (رواه احمد وابوداؤد وابن ماجه)
হাদীস নং: ২৮৯
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইস্তিগফারের বরকতসমূহ
২৮৯. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বুসর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন: আনন্দ ও মুবারকবাদ সে ব্যক্তির জন্যে, যে ব্যক্তি তার আমলনামায় বহুল পরিমাণে ইস্তিগফার পাবে। (অর্থাৎ আখিরাতে সে ব্যক্তি তার আমলনামায় প্রচুর পরিমাণে ইস্তিগফার লিখিত রয়েছে দেখতে পাবে।)
- (সুনানে ইবনে মাজা ও সুনানে নাসায়ী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ بُسْرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «طُوبَى لِمَنْ وَجَدَ فِي صَحِيفَتِهِ اسْتِغْفَارًا كَثِيرًا» (رواه ابن ماجه والنسائى)
হাদীস নং: ২৯০
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ ইস্তিগফার গোটা উম্মতের জন্যে নিরাপত্তা স্বরূপ

উপরে বর্ণিত হাদীসদ্বয়ে ইস্তিগফারের যে বরকত সমূহের কথা উল্লেখিত হয়েছে, তা ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ের অর্থাৎ তার সুফল ইস্তিগফারী ব্যক্তিরাই কেবল লাভ করবেন। পক্ষান্তরে নিম্নে বর্ণিত হাদীসের দ্বারা জানা যাবে যে, এই ব্যক্তিগত বরকত ছাড়াও ইস্তিগফারকারীদের ইস্তিগফারের এক বহু বড় এবং ব্যাপক বরকত এই যে. তা গোটা উম্মতের জন্যে ব্যাপক আযাব ও গযব থেকে নিরাপত্তা স্বরূপ এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর গোটা উম্মত এরই ছায়াতলে অবস্থান করেছে।
২৯০. হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, আল্লাহ্ তা'আলা আমার উম্মতের জন্যে দু'টি নিরাপত্তা আমার প্রতি নাযিল করেছেন।
(সূরা আনফালে বলা হয়েছেঃ)
وَمَا كَانَ اللّٰهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَاَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللّٰهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ.
"আল্লাহ তা'আলা এমনটি করবেন না যে, হে রাসূল, আপনি তাদের মধ্যে বিরাজমান থাকবেন আর আল্লাহ্ আযাব নাযিল করবেন; আর এমনটিও হতে পারে না যে, তারা ইস্তিগফার করতে থাকবে আর আল্লাহ্ তাদেরকে আযাবে লিপ্ত করবেন।"
(তিনি বলেন): তারপর যখন আমি চলে যাব, তখন কিয়ামত পর্যন্ত কালের জন্যে তোমাদের মধ্যে (নিরাপত্তা ও রক্ষাকবচ স্বরূপ) ইস্তিগফার রেখে যাব।
-(জামে' তিরমিযী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي مُوسَى، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَيَّ أَمَانَيْنِ لأُمَّتِي {وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ} فَإِذَا مَضَيْتُ تَرَكْتُ فِيهِمُ الاِسْتِغْفَارَ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ. (رواه الترمذى)
হাদীস নং: ২৯১
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ তাওবা-ইস্তিগফার দ্বারা আল্লাহ্ কতটুকু খুশি হন

তাওবা-ইস্তিগফার সংক্রান্ত হাদীসসমূহের সিলসিলা নিম্নলিখিত হাদীস দ্বারাই সমাপ্ত করা হচ্ছে, যা সহীহ বুখারী এবং সহীহ্ মুসলিমেও এক বিরাট সংখ্যক সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে এবং যাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তওবাকারীদেরকে সেই সুসংবাদ শুনিয়েছেন, যা অন্যান্য বড় বড় আমলের ব্যাপারেও শুনাননি। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা'আলার রহমতের শান উপলব্ধির জন্যে এই একখানি মাত্র হাদীস হলেও তাই যথেষ্ট হতো। সত্য কথা হলো, এই কয়েক ছত্রের হাদীসখানা মা'রিফতের একটা গোটা দফতর স্বরূপ। আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে বোধশক্তি ও একীন নসীব করুন।
২৯১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, আল্লাহর কসম, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মু'মিন বান্দার তাওবা দ্বারা তার চাইতে বেশি খুশি হননি যে ব্যক্তি (তার সফরে) কোন বিজন ভয়ঙ্কর বিপদসঙ্কুল প্রান্তরে গিয়ে উপনীত হয়েছে, সাথে আছে কেবল তার উটনীটি-তার উপর আহার্য ও পানীয় দ্রব্যাদি। তার পর সে সেখানে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। তার নিদ্রা এসে গেল। তারপর যখন চোখ খুললো তখন দেখতে পেলো যে, উটনীটি (সমস্ত সামানপত্র সহ) গায়েব। তারপর সে তা খুঁজতে খুঁজতে খরতাপ পিপাসা ইত্যাদিতে এতই কাতর হয়ে পড়লো যে, তার প্রাণান্তকর অবস্থা হলো। তখন সে ভাবলো (এখন আমার জন্যে এটাই উত্তম হবে যে,) আমি আমার পূর্বের স্থানে গিয়ে শুয়ে পড়ি এবং আমৃত্যু সেখানেই নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে থাকি। তখন সে বাহুর উপর মাথা রেখে মৃত্যুর উদ্দেশ্যে শুয়ে পড়ে। তারপর যখন চোখ খুললো তখন দেখতে পেলো যে, তার উটনীটি তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে। তার উপর তার আহার্য পানীয় সবকিছুই ঠিকঠাক ভাবে রয়েছে। এ ব্যক্তিটি তার হারানো উটনীটি দ্রব্যসম্ভারসহ পেয়ে যে পরিমাণ খুশি হবে, আল্লাহর কসম, মু'মিন বান্দার তাওবা করায় আল্লাহ তার চাইতে বেশি খুশি হয়ে থাকেন।
- (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: " لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ الْمُؤْمِنِ، مِنْ رَجُلٍ فِي أَرْضٍ دَوِّيَّةٍ مَهْلِكَةٍ، مَعَهُ رَاحِلَتُهُ، عَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ، فَنَامَ فَاسْتَيْقَظَ وَقَدْ ذَهَبَتْ، فَطَلَبَهَا حَتَّى أَدْرَكَهُ الْعَطَشُ، ثُمَّ قَالَ: أَرْجِعُ إِلَى مَكَانِيَ الَّذِي كُنْتُ فِيهِ، فَأَنَامُ حَتَّى أَمُوتَ، فَوَضَعَ رَأْسَهُ عَلَى سَاعِدِهِ لِيَمُوتَ، فَاسْتَيْقَظَ وَعِنْدَهُ رَاحِلَتُهُ وَعَلَيْهَا زَادُهُ وَطَعَامُهُ وَشَرَابُهُ، فَاللهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ الْعَبْدِ الْمُؤْمِنِ مِنْ هَذَا بِرَاحِلَتِهِ وَزَادِهِ " (رواه البخارى ومسلم)
হাদীস নং: ২৯২
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দরূদ ও সালাম

সালাত ও সালাম তথা দরূদ শরীফ এক প্রকার সর্বোত্তম ও সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন দু'আ, যা আল্লাহ পাকের দরবারে গিয়ে থাকে এবং যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্তার সাথে ঈমানী সম্পর্ক এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার অভিব্যক্তিস্বরূপ তাঁর জন্যে করা হয়ে থাকে। এর আদেশ স্বয়ং আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে পাক কুরআনে ঘোষিত হয়েছে:
{ إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا } [الأحزاب: 56]
এ আয়াতে ঈমানদারদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, তারা যেন আল্লাহর রাসূলের প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করে। (আর এটাই হচ্ছে আয়াতের আসল প্রতিপাদ্য।) এ সম্বোধন ও আদেশের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা এবং এতে জোর দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভূমিকা স্বরূপ বলা হয়েছেঃ
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ
অর্থাৎ নবীর প্রতি সালাত (যার নির্দেশ তোমাদেরকে দেওয়া হচ্ছে) আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর পবিত্র ফিরিশতাকুলের আচরিত অভ্যাস, তোমরাও একে তোমাদের অভ্যাসে পরিণত করে এই প্রিয় ও মুবারক আমলে শরীক হয়ে যাও!

আদেশে দান ও সম্বোধনের এ ভঙ্গিটি কুরআনে পাকে কেবল মাত্র সালাত ও সালামের ক্ষেত্রেই অবলম্বন করা হয়েছে। অন্য কোন আমলের ব্যাপারেই এরূপ বলা হয়নি যে, স্বয়ং আল্লাহ এবং তাঁর ফিরিশতাগণ এরূপ করে থাকেন, সুতরাং তোমরাও এমনটি করবে। নিঃসন্দেহে এটা সালাত ও সালামের অনন্য বৈশিষ্ট্য-এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মকামে-মহবুবিয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্যও বটে।

নবীর প্রতি সালাতের মর্ম এবং একটি সন্দেহ নিরসন

সূরা আহযাবের উক্ত আয়াতের দ্বারা অনেকের মনে একটা খটকা লেগে যায় যে, উক্ত আয়াতে আল্লাহ ও ফিরিশতাদের বেলায়ও সালাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
আবার মু'মিন বান্দাদের বেলায়ও ঐ একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ হাকীকতের দিক থেকে আল্লাহ ফিরিশতাকুল এবং মু'মিন বান্দাদের আমল নিশ্চয়ই ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকবে।

আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি যে 'সালাত'-যাকে এ আয়াতে ফিরিশতাদের সাথেও সম্পৃক্ত করে يُصَلُّوْنَ (তাঁরা সকলে সালাত প্রেরণ করেন) বলা হয়েছে এবং সকলের আমলকেই এক শব্দে 'সালাত' বলা হয়েছে, তা তো কোনক্রমেই মু'মিনদেরও আমল হতে পারে না। অনুরূপ, ঈমানদার বান্দাদেরকে صَلُّو বলে যে 'সালাত'-এর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা' কখনো স্বয়ং আল্লাহর কাজ হতে পারে না।

এ সন্দেহ ভঞ্জনের উদ্দেশ্যে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, সালাত শব্দটিকে যখন যার দিকে সম্পৃক্ত বা সম্বোধিত করা হয়, তখন তার হিসাবে তার অর্থ হয়ে থাকে। যখন আল্লাহর দিকে এ শব্দটিকে সম্পৃক্ত করা হয়, তখন তার অর্থ হয় রহমত বর্ষণ করা, আর যখন ফিরিশতাকুল এবং মু'মিনদের সাথে তা সম্পৃক্ত হয়। তখন তার অর্থ হয় আল্লাহর দরবারে রহমত বর্ষণের দু'আ করা। কিন্তু বিশুদ্ধতর কথা হলো, সালাত শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। সম্মানিত করা, প্রশংসা করা, মর্যাদা সমুন্নত করা। প্রীতি বাৎসল্য, বরকত-রহমত, স্নেহ- সোহাগ করা, সদিচ্ছা, নেক দু'আ বা আশীর্বাদ করা এ সব অর্থেই সালাত শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এজন্যে তা আল্লাহ, ফিরিশতাকুল এবং মু'মিন বান্দাদের সকলের পক্ষ থেকেই সমভাবে হতে পারে। অবশ্য, এটুকু পার্থক্য থাকবে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে 'সালাত' তাঁর উচ্চ শান অনুযায়ীই হবে। ফিরিশতাগণের 'সালাত' হবে তাঁদের মর্যাদা অনুপাতে এবং মু'মিন বান্দাদের সালাত হতে তাঁদের নিজেদের মর্যাদা অনুপাতে।

সে হিসাবে এ আয়াতের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর প্রতি অত্যন্ত সদয় ও প্রসন্ন, তাঁর আদর-সোহাগ অহরহ তাঁর প্রতি বর্ষিত হচ্ছে। তিনি তাঁর প্রশংসায় মুখর এবং উচ্চ থেকে উচ্চতর মর্যাদায় তিনি তাঁকে আসীন করতে যত্নবান। ফিরিশতাগণও তাঁকে অত্যন্ত সম্মান-সমীহ করে থাকেন। তাঁর প্রশংসা ও স্তব-স্তুতিতে তাঁরাও পঞ্চমুখ। সতত তাঁরা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আয়রত। সুতরাং হে মু'মিন বান্দারা! তোমরাও অনুরূপ কর! সর্বদা আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাঁর জন্যে স্নেহ-বাৎসল্য, মর্যাদাবৃদ্ধি, মকামে মাহমূদে আসীন করা এবং গোটা বিশ্বের ইমামত, তাঁর সীমাহীন কবুলিয়াত এবং শাফা'আতের দু'আ করে তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ কর!

সালাত ও সালামের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব

এ আয়াতে যে শানদার ভূমিকা দিয়ে যে গুরুত্ব সহকারে ঈমানদারগণকে সালাত ও সালামের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা থেকেই এর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য এবং আল্লাহর কাছে তা অত্যন্ত প্রিয় আমল হওয়াটা সুস্পষ্ট। পরবর্তী হাদীসগুলো দ্বারা জানা যাবে যে, ঈমানদার বান্দাদের জন্যে তাতে কতটুকু খায়র-বরকত ও রহমত নিহিত রয়েছে।

সালাত ও সালাম সম্পর্কে ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণের বিভিন্ন মসলক

গোটা মুসলিম জাতির ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ প্রায় ঐকমত্য পোষণ করেন যে, সূরা আহযাবের উক্ত আয়াতের নির্দেশ অনুসারে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরয। ইমাম শাফেয়ী এবং এক রিওয়ায়াত অনুসারে ইমাম আহমদও বলেন, প্রত্যেক সালাতের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরূদ পাঠ ওয়াজিব। তা না করলে সালাত আদায় হবে না। কিন্তু ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানীফা এবং অধিকাংশ ফকীহগণের অভিমত হলো, শেষ বৈঠক তো নিঃসন্দেহে ওয়াজিব, যাতে প্রাসঙ্গিকভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর দরূদ-সালামও এসে যায়। কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে দরূদ শরীফ পাঠ ফরয বা ওয়াজিব নয়, বরং তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতপূর্ণ সুন্নত-যা ছুটে গেলে সালাতে অনেক কমতি ও অপূর্ণতা রয়ে যায়। কিন্তু এ মতদ্বৈততা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে প্রায় সকলেই ঐকমত্য পোষণ করেন যে, উক্ত আয়াতের নির্দেশ অনুসারে প্রতিটি মুসলমানের উপর ব্যক্তিগতভাবে সালাত ও সালাম প্রেরণ ফরযে আইন, যেমনটি তাঁর রিসালাতের সত্যতার সাক্ষ্যদান ওয়াজিব-যার জন্যে কোন নির্দিষ্ট সময় বা সংখ্যার বাধ্যবাধকতা নেই। এর সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে অন্তত জীবনে একবার তা করতে হবে এবং তার উপর কায়েম থাকতে হবে।

পরবর্তীতে হাদীস আসছে-যদ্বারা জানা যাবে যে, যখনই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নাম বা প্রসঙ্গ আসবে তখনই অতি অবশ্য তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করতে হবে। এ ব্যাপারে অবহেলাকারীর প্রতি কঠোর সতর্কবাণীর কথাও বর্ণিত হবে। এসব হাদীসের ভিত্তিতে অনেক ফকীহর অভিমত হচ্ছে, যখনই কেউ হুযুর পাক ﷺ-এর উল্লেখ করবেন বা অন্য কারো মুখে তাঁর নাম শুনবেন তখন তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ ওয়াজিব। একটি অভিমত হলো একই মজলিসে যদি বারবার তাঁর নাম উচ্চারিত হয় বা তাঁর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়, তখন প্রতিবারই তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ ওয়াজিব হবে। অন্য এক অভিমত হচ্ছে, প্রথমবার দরূদ পাঠ ওয়াজিব এবং পরবর্তী প্রতিবার দরূদ পাঠ মুস্তাহাব। মুহাক্কিক আলিমগণ এ অভিমতই গ্রহণ করেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।

দরূদ শরীফের বৈশিষ্ট্য

আল্লাহ তা'আলা যেভাবে আমাদের জড়জগতে ফলফুলের ভিন্ন ভিন্ন রংরূপ দান করেছেন এবং এগুলোর ভিন্ন ভিন্ন সুবাস দিয়েছেন: (ফার্সী কবির ভাষায়: پرگلے رارنگ وبوئے دیگر است) অনুরূপ বিভিন্ন ইবাদত, যিকর ও দু'আর ভিন্ন ভিন্ন খাসিয়াত (বৈশিষ্ট্য) ও বরকত রেখেছেন। দরূদ শরীফের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে খালিস অন্তরে বহুল পরিমাণে দরূদ শরীফ পাঠে আল্লাহর খাস রহমতের দৃষ্টি, রাসূলুল্লাহ (স)-এর রূহানী নৈকট্য এবং তাঁর বিশেষ অনুরাগ লাভের এটি হচ্ছে সবচাইতে খাস ওসীলা। পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহে উল্লিখিত হাদীসগুলো দ্বারা এটাও জানা যাবে যে প্রত্যেকটি উম্মতের দরূদ ও সালাম তার নামধামসহ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট পৌঁছানো হয়ে থাকে। এ জন্যে ফিরিশতাদের রীতিমত একটি বিভাগ রয়েছে।

একটু চিন্তা করুন, আপনি যদি জানতে পারেন, আল্লাহর অমুক বান্দা আপনার জন্যে এবং আপনার পরিবার-পরিজনের জন্যে অহরহ নেক দু'আ করে থাকে। সে তার নিজের জন্যে ততটুকু দু'আ করে না, যতটুকু আপনার জন্যে করে থাকে এবং এটা তার অত্যন্ত প্রিয় কাজ, তাহলে আপনার অন্তরে তার জন্য কতটুকু ভালবাসা এবং তার মঙ্গল কামনার উদ্রেক হতে পারে। তারপর যখনই আল্লাহ্ ঐ বান্দা আপনার সম্মুখে আসবে বা আপনার সাথে দেখা করবে, তখন আপনি তার সাথে কী আচরণ করবেন?

এ উপমা দ্বারা বুঝা যেতে পারে যে, আল্লাহর যে বান্দা ঈমান ও ইখলাস সহকারে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি বহুলভাবে দরূদ ও সালাম পাঠ করবে, তার প্রতি তিনি কতটুকু প্রসন্ন থাকবেন এবং কিয়ামতের দিন তার সাথে তাঁর কী কায়কারবার হবে? আল্লাহর নিকট রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যে মর্যাদার আসন রয়েছে, সে দিকে লক্ষ্য রেখে একটু অনুমান করুন তো, এ বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলা কতটুকু প্রসন্ন থাকবেন এবং তার প্রতি তিনি কতটুকু সদয় থাকবেন।

দরূদ ও সালামের উদ্দেশ্য

এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দরূদ ও সালাম বাহ্যত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে দু'আ হলেও যেভাবে অন্যদের জন্যে দু'আ তাদের উপকারার্থে করা হয়ে থাকে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি দু'আর উদ্দেশ্য সেরূপ তাঁকে উপকৃত করা থাকে না। আমাদের দু'আর তাঁর আদৌ কোন প্রয়োজন বা মুখাপেক্ষিতা নেই, গরীব-মিসকীনদের হাদিয়া-তুহফার বাদশাহদের কী প্রয়োজন! বরং আল্লাহ তা'আলার যেমন আমাদের বান্দাদের উপর হক হচ্ছে ইবাদত ও স্তব-স্তুতির দ্বারা নিজেদের আবদিয়াত এবং উবুদিয়াত বা দাসত্বের নযরানা তাঁর হুযুরে পেশ করা, এতে আল্লাহর নিজের কোন ফায়দা নেই, বরং তা আমাদের নিজেদেরই ঠেকা! আর এর ফায়দা আমরা নিজেরাই পেয়ে থাকি। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কৃতিত্ব ও কামালাত, তাঁর পয়গম্বরসুলভ খিদমতসমূহ এবং উম্মতের প্রতি তাঁর ইহসানসমূহের প্রেক্ষিতে তাঁর হক হচ্ছে উম্মত তাদের আনুগত্য, নিয়াযমন্দী ও কৃতজ্ঞতার হাদিয়া-নযরানা স্বরূপ দরূদ ও সালাম প্রেরণ করবে। আর যেমনটি উপরে বলা হয়েছে, এর দ্বারা তাঁর উপকার সাধন উদ্দিষ্ট নয় বরং নিজেদেরই উপকার সাধন তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি, আখিরাতের ছাওয়াব, তাঁর মহান রাসূলের রূহানী নৈকট্য এবং তাঁর খাস সদয় দৃষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই দরূদ ও সালাম পাঠ করা হয়ে থাকে। দরূদ পাঠকারীর আসল উদ্দিষ্ট থাকে তাই।

আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দয়াই বলতে হবে যে, তিনি আমাদের দরূদ ও সালামের হাদিয়াটুকু ফিরিশতাদের মাধ্যমে তাঁর রাসূলের খিদমতে পৌঁছিয়ে দেন এবং অনেকের সালাম কবর মুবারকে সরাসরি তাঁকে শুনিয়েও দিয়ে থাকেন। (যেমনটি পরবর্তী হাদীসসমূহ থেকে জানা যাবে।) উপরন্তু আমাদের সালাত ও সালামের অনুপাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি তাঁর দান এবং হুযুর ﷺ-এর দরজা বৃদ্ধিও করে থাকেন।

দরূদ ও সালামের খাস হিকমত

আম্বিয়ায়ে কিরাম বিশেষতঃ সাইয়েদুল আম্বিয়া ﷺ-এর খিদমতে ভক্তি-শ্রদ্ধা, মহব্বত, বিশ্বস্ততা ও কৃতজ্ঞতা মিশ্রিত হাদিয়াস্বরূপ দরূদ ও সালাম প্রেরণের তরীকা নির্ধারণ করার সবচাইতে বড় হিকমত হচ্ছে এই যে, এর দ্বারা শিরকের মূলোচ্ছেদ হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলার পরেই সর্বাধিক সম্মানিত ও পবিত্র সত্তার অধিকারী হচ্ছেন এই আম্বিয়ায়ে কিরাম আলাইহিমুস সালাম। তাঁদের মধ্যেও সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী হচ্ছেন খাতামুন নাবিয়‍্যীন সাইয়েদিনা হযরত মুহম্মদ মুস্তফা ﷺ। যখন তাঁর ব্যাপারেই এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাঁর প্রতি সালাম ও দরূদ প্রেরণ করতে হবে, (অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার দরবারে তাঁর জন্যে বিশেষ রহমত ও নিরাপত্তার দু'আ করতে হবে) তাতে বুঝা গেল যে, তিনিও আল্লাহ তা'আলার রহমত ও সদয় দৃষ্টির মুখাপেক্ষী আর তাঁর হক ও উচ্চতম মর্যাদার দাবি হচ্ছে তাঁর জন্যে আল্লাহ তা'আলার দরবারে উঁচু থেকে উঁচুতর দু'আ করতে হবে। তারপর শিরকের আর কোন অবকাশই থাকে না। পরম দয়াময় ও বদান্যশীল আল্লাহ তা'আলার কত বড় দয়া ও বদান্যতা যে, তাঁর এ হুকুম আমাদের মতো বান্দা ও উম্মতীদেরকে নবী রাসূলদের, বিশেষত সাইয়েদুল আম্বিয়া বা নবীকূল শিরোমণির জন্যে দু'আকারী বানিয়ে দিয়েছে। যে বান্দা এমন পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারীদের জন্যে দু'আ করে, সে কী করে অন্য মাখলুকের পূজারী হতে পারে?

এ ভূমিকাটির পর এবার সে হাদীসগুলো পাঠ করুন, যেগুলোতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর দরূদ পাঠের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং দরূদের ফযীলত ও বরকতের কথা বর্ণিত হয়েছে।

হাদীসে দরূদ ও সালামের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার ফাযায়েল ও বরকতসমূহ
২৯২. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, যে ব্যক্তি একবার আমার প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দশবার সালাম বর্ষণ করেন। (মুসলিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَلَّى عَلَيَّ مَرَّةً وَاحِدَةً، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا» (رواه مسلم)
হাদীস নং: ২৯৩
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দরূদ ও সালাম: হাদীসে দরূদ ও সালামের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার ফাযায়েল ও বরকতসমূহ
২৯৩. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি একবার আমার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দশবার সালাত প্রেরণ করেন তার দশটি পাপ মোচন হয় এবং তার দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি ঘটে।
- (সুনানে নাসায়ী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ، وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرُ خَطِيئَاتٍ، وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ» (رواه النسائى)
হাদীস নং: ২৯৪
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দরূদ ও সালাম: হাদীসে দরূদ ও সালামের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার ফাযায়েল ও বরকতসমূহ
২৯৪. আবু বুরদা ইবনে নিয়ার (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার উম্মতের যে কেউ অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে একবার আমার প্রতি সালাত প্রেরণ করবে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দশটি সালাত প্রেরণ করেন এবং এর বিনিময়ে তার দশটি স্তর উন্নীত করেন এবং তার জন্য দশটি নেকি লিখে দেন এবং তার দশটি পাপ মোচন করেন।
- (সুনানে নাসায়ী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي بُرْدَةَ بْنِ نِيَارٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ صَلَّى عَلَيَّ مِنْ أُمَّتِي صَلَاةً مُخْلِصًا مِنْ قَلْبِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرَ صَلَوَاتٍ، وَرَفَعَهُ بِهَا عَشْرَ دَرَجَاتٍ، وَكَتَبَ لَهُ بِهَا عَشْرَ حَسَنَاتٍ، وَمَحَا عَنْهُ عَشْرَ سيئاتٍ» (رواه النسائى)
হাদীস নং: ২৯৫
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দরূদ ও সালাম: হাদীসে দরূদ ও সালামের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার ফাযায়েল ও বরকতসমূহ
২৯৫. হযরত আবু তালহা (রা) থেকে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ তশরীফ আনলেন, তাঁর মুখমন্ডল তখন অত্যন্ত প্রসন্ন। (তার কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে) তিনি বললেন, আজ জিব্রাইল আমীন আসলেন এবং বললেন: আপনার প্রতিপালক বলছেন, হে মুহাম্মদ! একথা কি আপনাকে আনন্দিত করবে না যে, আপনার কোন উম্মতই এমন হবে না যে, সে আপনার প্রতি একবার সালাত প্রেরণ করবে অথচ আমি (আল্লাহ) তাঁর প্রতি দশবার সালাত বর্ষণ করব না। এবং আপনার কোন উম্মত এমন হবে না, যে আপনার প্রতি একবার সালাম প্রেরণ করবে অথচ আমি তার প্রতি দশবার সালাম প্রেরণ করবো না। (সুনানে নাসায়ী ও মুসনাদে দারেমী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي طَلْحَةَ رَضِي الله عَنهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَاءَ ذَاتَ يَوْمٍ وَالْبِشْرُ فِي وَجْهِهِ، فَقَالَ: " إِنَّهُ جَاءَنِي جِبْرِيلُ، فَقَالَ: إِنَّ رَبَّكَّ يَقُوْلُ أَمَا يُرْضِيكَ يَا مُحَمَّدُ أَنْ لَا يُصَلِّيَ عَلَيْكَ أَحَدٌ مِنْ أُمَّتِكَ إِلَّا صَلَّيْتُ عَلَيْهِ عَشْرًا، وَلَا يُسَلِّمَ عَلَيْكَ أَحَدٌ مِنْ أُمَّتِكَ إِلَّا سَلَّمْتُ عَلَيْهِ عَشْرًا " (رواه النسائى والدارمى)
হাদীস নং: ২৯৬
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দরূদ ও সালাম: হাদীসে দরূদ ও সালামের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার ফাযায়েল ও বরকতসমূহ
২৯৬. হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) থেকে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ লোকালয় থেকে বের হয়ে একটি খেজুর বাগানে প্রবেশ করলেন এবং সিজদায় গিয়ে তা এত দীর্ঘ করলেন যে, আমার আশঙ্কা হলো, আল্লাহ তাঁর জান কবয করে নেননি তো! আমি তখন তাঁর নিকটবর্তী হয়ে গভীরভাবে দেখতে লাগলাম, এমন সময় তিনি তাঁর মাথা উঠালেন। তারপর আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমার কী হলো হে? (অমন করে কী দেখছো?) আমি বললাম, (দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত আপনার সিজদা থেকে মাথা না উঠানোর দরুণ) আমার সন্দেহ হয়, এ জন্যে আমি আপনাকে (গভীরভাবে) দেখছিলাম।

তখন তিনি বললেন, আসল ব্যাপার হচ্ছে এই যে, জিব্রাইল (আ) এসে আমাকে বললেন, আমি কি আপনাকে একটি সুসংবাদ শুনাবো না? আল্লাহ তা'আলা আপনাকে বলছেন: যে ব্যক্তি আপনার প্রতি সালাত প্রেরণ করবে আমিও তার প্রতি সালাত প্রেরণ করবো আর যে ব্যক্তি আপনার প্রতি সালাম প্রেরণ করবে আমিও তার পতি সালাম প্রেরণ করবো। - (মুসনাদ আহমদ)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ، قَالَ: خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاتَّبَعْتُهُ حَتَّى دَخَلَ نَخْلًا فَسَجَدَ، فَأَطَالَ السُّجُودَ حَتَّى خَشِيتُ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ قَدْ تَوَفَّاهُ قَالَ: فَجِئْتُ أَنْظُرُ فَرَفَعَ رَأْسَهُ، فَقَالَ: «مَا لَكَ يَا عَبْدَ الرَّحْمَنِ» قَالَ: فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لَهُ، قال: فَقَالَ: " إِنَّ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلامُ قَالَ لِي: أَلا أُبَشِّرُكَ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ لَكَ: مَنْ صَلَّى عَلَيْكَ صَلَّيْتُ عَلَيْهِ، وَمَنْ سَلَّمَ عَلَيْكَ سَلَّمْتُ عَلَيْهِ " (رواه احمد)
হাদীস নং: ২৯৭
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ দরূদ ও সালাম: হাদীসে দরূদ ও সালামের প্রতি উৎসাহ দান এবং তার ফাযায়েল ও বরকতসমূহ
২৯৭. প্রায় সমার্থক একখানি হাদীস তাবারানী তাঁর নিজস্ব সনদে হযরত উমর (রা) থেকেও বর্ণনা করেন। তাতেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি অসাধারণ সিজদাহর উল্লেখ রয়েছে। তার শেষ অংশে আছে: সিজদা থেকে উঠে তিনি আমাকে বললেন:

إِنَّ جِبْرَئِيلَ أَتَانِي فَقَالَ مَنْ صَلَّى عَلَيْكَ مِنْ أُمَّتِكَ وَاحِدَةً صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ عَشْرًا وَرَفَعَهُ بِهَا عَشْرَ دَرَجَاتٍ

"জিবরাঈল আমার কাছে এসে এ পয়গাম পৌঁছালেন যে, আপনার যে উম্মতই আপনার প্রতি একবার সালাত প্রেরণ করবে, আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি দশবার সালাত বর্ষণ করবেন এবং এর দ্বারা তার মর্যাদা দশটি স্তর উন্নীত করবেন।"

এসব হাদীসের উদ্দেশ্য ও বক্তব্য হচ্ছে উম্মতীদেরকে একথা জানান যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সালাত ও সালামের 'তোহফা' এবং তাঁর অফুরন্ত রহমত লাভের একটি অতি কার্যকরী এবং সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ। আল্লাহ তা'আলা এক একবারের সালাত ও সালামের বিনিময়ে দশ দশবার সালাত ও সালাম বর্ষণ করেন এবং দশটি করে মর্যাদার স্তর উন্নীত করে দেন। আমলনামা থেকে দশটি গুনাহ মোচন করে দেন এবং দশটি করে নেকি লিখে দেন। উদাহরণ স্বরূপ কোন ব্যক্তি যদি প্রত্যহ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি কেবল একশ' বার করে দরূদ শরীফ পাঠ করে, তাহলে হাদীসসমূহ প্রদত্ত সুসংবাদ অনুসারে (যা এক দু'জন নয়, অনেক অনেক সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত এবং সিহাহ, সুনান ও মুসনদ জাতীয় প্রায় সঙ্কলনসমূহে বিশ্বস্ত রাবীগণের মাধ্যমে বর্ণিত ও উদ্ধৃত) তার প্রতি আল্লাহ তা'আলা এক হাজার সালাত ও রহমত বর্ষণ করেন। তার মর্যাদার এক হাজার স্তর উন্নীত হয়। তার আমলনামা থেকে এক হাজার গুনাহ মোচন করা হয় এবং তার স্থলে এক হাজার নেকি লিখিত হয়। আল্লাহু আকবর! কতই না সস্তা অথচ উপকারী সওদা! কতই না ক্ষতিগ্রস্ত ও হতাভাগ্য ঐ সব ব্যক্তি, যারা ঐ সৌভাগ্য এবং উপার্জন থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত রাখলো। আল্লাহ তা'আলা একীন নসীব করুন এবং আমলের তাওফীক দান করুন।
کتاب الاذکار والدعوات
إِنَّ جِبْرَئِيلَ أَتَانِي فَقَالَ مَنْ صَلَّى عَلَيْكَ مِنْ أُمَّتِكَ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا وَرَفَعَهُ بِهَا عَشْرَ دَرَجَات. (معجم اوسط للطبراني وسنن سعيد بن منصور)
tahqiq

তাহকীক:

হাদীস নং: ২৯৮
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উল্লেখ কালে দরূদের ব্যাপারে গাফেল ব্যক্তিদের বঞ্চনা
২৯৮. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, অপদস্থ হোক সে ব্যক্তি, যার সম্মুখে আমার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হল অথচ সে আমার প্রতি দরূদ পাঠ করলো না। অপদস্থ হোক সে ব্যক্তি যার জন্যে রমযান (এর মত রহমত ও মাগফিরাতের) মাস এলো এবং তার জন্যে মাগফিরাতের ফয়সালা না হতেই তা চলেও গেল। অপদস্থ হোক সে ব্যক্তি, যার পিতামাতা উভয়কে অথবা তাদের যে কোন একজনকে তাদের বার্ধক্যের অবস্থায় পেলো অথচ সে তাদের খিদমত ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করতে পারলো না।
(জামে' তিরমিযী)।
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ، وَرَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ دَخَلَ عَلَيْهِ رَمَضَانُ ثُمَّ انْسَلَخَ قَبْلَ أَنْ يُغْفَرَ لَهُ، وَرَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ أَدْرَكَ عِنْدَهُ أَبَوَاهُ الكِبَرَ أَوْ أَحَدُهُمَا فَلَمْ يُدْخِلاَهُ الجَنَّةَ. (رواه الترمذى)
হাদীস নং: ২৯৯
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উল্লেখ কালে দরূদের ব্যাপারে গাফেল ব্যক্তিদের বঞ্চনা
২৯৯. হযরত কা'আব ইব্‌ন উজরা আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে নিকটে ভিড়ে বসার জন্যে বললেন, নিকটে এসো। আমরা তাঁর নিকটে ভিড়ে বসলাম। তিনি (তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে) মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে কদম রেখেই বললেন: আমীন। তারপর দ্বিতীয় সিঁড়িতে কদম রেখেও বললেন আমীন। তারপর তৃতীয় সিঁড়িতে কদম রাখলেন এবং বললেন, আমীন।
তারপর যখন ভাষণ অন্তে মিম্বর থেকে নেমে আসলেন তখন আমরা আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আমরা এমন কিছু শুনলাম যা ইতিপূর্বে কখনো শুনিনি। (অর্থাৎ মিম্বরের প্রত্যেক সিঁড়িতে কদম রাখার সময় আমীন বলাটা)।
জবাবে তিনি বললেন, আমি যখন মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে কদম রাখলাম, তখন জিবরাইল আমীন এসে বললেন:
بَعُدَ مَنْ أَدْرَكَ رَمَضَانَ فَلَمْ يُغْفَرْ لَهُ
-"ঐ ব্যক্তি ধ্বংস হোক, আল্লাহর রহমত থেকে দূর হোক, যে রমযান মাস পেলো, অথচ তাকে ক্ষমা করা হলো না।" তখন আমিও বললাম: আমীন! (অর্থাৎ তাই হোক) তারপর যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে কদম রাখলাম, তখন তিনি পুনরায়
بَعُدَ مَنْ ذُكِرْتَ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْكَ
-"ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি, যার সম্মুখে আপনার প্রসঙ্গ উঠলো, সে আপনার প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করলো না। আমিও বললাম: আমীন! (তাই হোক!) অতঃপর আমি যখন তৃতীয় সিঁড়িতে কদম রাখলাম তখন জিবরাইল বলে উঠলেন:
بَعُدَ مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ الْكِبَرُ أَوْ أَحَدَهُمَا فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ
-ধ্বংস হোক সে হতভাগা ব্যক্তি, যার সম্মুখে তার পিতামাতা উভয়েই বা তাদের কোন একজন বার্ধক্যে উপনীত হলো, অথচ সে তাদের খিদমত ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে বেহেশতে প্রবেশের উপযুক্ত হতে পারলো না। আমি বললাম: আমীন! (তাই হোক!)
- (মুস্তাদরাকে হাকিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ كَعْبِ بْنِ عُجْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " احْضُرُوا فَحَضَرْنَا، فَلَمَّا ارْتَقَى الدَرَجَةَ قَالَ: " آمِينَ "، فَلَمَّا ارْتَقَى الدَّرَجَةَ الثَّانِيَةَ قَالَ: " آمِينَ "، فَلَمَّا ارْتَقَى الدَّرَجَةَ الثَّالِثَةَ قَالَ: " آمِينَ "، فَلَمَّا فَرَغَ نَزَلَ مِنَ الْمِنْبَرِ قَالَ: فَقُلْنَا له يَا رَسُولَ اللهِ سَمِعْنَا الْيَوْمَ مِنْكَ شَيْئًا مَا كُنَّا نَسْمَعُهُ فَقَالَ: " إِنَّ جِبْرِيلَ عَرْضَ لِي فَقَالَ: بَعُدَ مَنْ أَدْرَكَ رَمَضَانَ فَلَمْ يُغْفَرْ لَهُ فَقُلْتُ: آمِينَ فَلَمَّا رَقِيتُ الثَّانِيَةَ قَالَ: بَعُدَ مَنْ ذُكِرْتَ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْكَ فَقُلْتُ: آمِينَ، فَلَمَّا رَقِيتُ الثَّالِثَةَ قَالَ: بَعُدَ مَنْ أَدْرَكَ اَبَوَيْهِ الْكِبَرَ عِنْدَهُ أَوْ أَحَدُهُمَا، فلَمْ يُدْخِلِ الْجَنَّةَ فَقُلْتُ: آمِينَ " (رواه الحاكم فى المستدرك وقال صحيح الاسناد)
হাদীস নং: ৩০০
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
পরিচ্ছেদঃ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উল্লেখ কালে দরূদের ব্যাপারে গাফেল ব্যক্তিদের বঞ্চনা
৩০০. হযরত আলী মুরতাযা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, জাত কৃপণ হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যার সম্মুখে আমার প্রসঙ্গ উল্লেখিত হলো অথচ সে (একটু ঠোঁট-রসনা নাড়িয়ে) আমার প্রতি দরূদও পড়ে না।
- (জামে' তিরমিযী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ عَلِيِّ رَضِي الله عَنهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: البَخِيلُ الَّذِي مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ. (رواه الترمذى)